রমজান মাস মুসলমানদের জন্য এক বিশেষ রহমতের মাস। এ মাসে তারাবির নামাজ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি এশার নামাজের পর আদায় করা হয় এবং বিশ রাকাত সুন্নত নামাজ হিসেবে পরিচিত। তারাবির নামাজ আদায় করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা, যা প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিজে আদায় করেছেন এবং সাহাবাদেরও আদায় করতে বলেছেন।

তারাবির নামাজের ইতিহাস
তারাবির নামাজ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সময় বিদ্যমান ছিল এবং তিনি সাহাবিদের নিয়ে কয়েক রাত জামাতে আদায় করেছেন। তবে তিনি পুরো রমজান মাস জামাতে আদায় করেননি, কারণ এটি উম্মতের ওপর ফরজ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। হযরত উমর (রা.)-এর খিলাফতের সময় সাহাবাদের সম্মতিতে এটি জামাতে বিশ রাকাত পড়া হয় এবং এভাবেই ইসলামী বিশ্বে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
তারাবির নামাজের ফজিলত
১. গুনাহ মাফের সুযোগঃ হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় তারাবির নামাজ আদায় করবে, তার পূর্ববর্তী সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে (বুখারি, মুসলিম)।
২. শবে কদরের নৈকট্যঃ রমজানের রাতগুলো বিশেষভাবে বরকতময়, এবং তারাবির নামাজ আদায়ের মাধ্যমে শবে কদরের সওয়াব অর্জন করা সম্ভব।
৩. কিয়ামুল লাইলের সওয়াবঃ তারাবির নামাজ কিয়ামুল লাইল বা রাতের নামাজের অন্তর্ভুক্ত। এটি আদায় করলে রাতজাগরণের সওয়াব পাওয়া যায়।
৪. শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তিঃ তারাবির নামাজ দীর্ঘ সময় ধরে পড়ার ফলে শরীর সক্রিয় থাকে, যা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। পাশাপাশি এটি আত্মিক প্রশান্তিও প্রদান করে।
বিভিন্ন মাজহাব অনুযায়ী তারাবির গুরুত্ব
হানাফি মাজহাবঃ বিশ রাকাত তারাবি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। এটি একত্রে জামাতে আদায় করা উত্তম।
মালিকি মাজহাবঃ বিশ রাকাতের চেয়ে বেশি পড়া হলে তাতে কোনো সমস্যা নেই। সাধারণত বিশ রাকাত আদায় করা হয়।
শাফেয়ী মাজহাবঃ বিশ রাকাত তারাবি সুন্নাত এবং এটি জামাতে আদায় করা উত্তম।
হানাবলি মাজহাবঃ বিশ রাকাত সুন্নাত, তবে কেউ যদি কম বা বেশি রাকাত পড়তে চায়, তবে সেটি বৈধ।
তারাবির নামাজের নিয়ম
১. এশার ফরজ ও সুন্নত নামাজ আদায়ের পর তারাবির নামাজ শুরু করতে হয়।
২. সাধারণত দুই রাকাত করে মোট বিশ রাকাত আদায় করা হয়।
৩. প্রতি চার রাকাত শেষে একটু বিশ্রাম নেওয়া হয়, যা ‘তারাবিহ’ অর্থাৎ বিশ্রাম থেকে এসেছে।
৪. সাধারণত জামাতে আদায় করা হয়, তবে একাকী পড়লেও কোনো সমস্যা নেই।
৫. প্রতি দুই রাকাত পরপর সালাম ফেরাতে হয়।
তারাবির নামাজের রাকাত সংখ্যা
সাধারণভাবে ২০ রাকাত পড়া হয়, তবে কেউ যদি ৮ রাকাত আদায় করতে চান, তাতেও কোনো সমস্যা নেই।
তারাবির নামাজের নিয়ত
উচ্চারণঃ “উসাল্লি সুন্নাতাত তারাবিহি রাকআতাইনি লিল্লাহি তা’আলা”
অর্থ: আমি আল্লাহর উদ্দেশ্যে দুই রাকাত তারাবির নামাজ আদায় করার নিয়ত করছি।
তারাবির নামাজের দোয়া
তারাবির নামাজের পর সাধারণত ‘তাসবিহে তারাবিহ’ পড়া হয়।
উচ্চারণঃ“সুবহানা জিল মুলকি ওয়াল মালাকূত। সুবহানা জিল ইজ্জতি ওয়াল আজমাহ। সুবহানা জিল কুদরতি ওয়াল কিবরিয়াই ওয়াল জাবারূত। সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদু লিল্লাহি ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার। ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আজিম।”
তারাবির নামাজের মোনাজাত
তারাবির নামাজের পর দীর্ঘ মোনাজাত করা হয়। নিচে একটি সংক্ষিপ্ত মোনাজাত দেওয়া হলোঃ
উচ্চারণঃ
“আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন, তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্না। আল্লাহুম্মাগফির লানা, ওয়ারহামনা, ওয়া তুব আলাইনা। আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল সলাতানা, ওয়া কিয়ামানা, ওয়া সিয়ামানা। আমিন।”
অর্থ:
হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, আমাদের ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ, আমাদের নামাজ, রোজা ও অন্যান্য ইবাদত কবুল করুন এবং আমাদের ওপর দয়া করুন। আমিন।
আধুনিক যুগে তারাবির গুরুত্ব
আজকের ব্যস্ত জীবনে তারাবির নামাজ মুসলমানদের জন্য আত্মিক প্রশান্তির মাধ্যম। আধুনিক সমাজে প্রযুক্তি ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে অনেকেই রাতের ইবাদত থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, কিন্তু তারাবির নামাজ মুসলমানদের জন্য রাতের সেরা ইবাদত।
১. সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করে: মসজিদে জামাতে আদায়ের মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ বাড়ে।
২. ব্যস্ত জীবনে আধ্যাত্মিক প্রশান্তি: সারাদিনের কাজের পর তারাবির নামাজ মনকে প্রশান্তি দেয় এবং আত্মিক শক্তি বাড়ায়।
৩. পরিবারে ধর্মীয় পরিবেশ সৃষ্টি করে: তারাবির নামাজ পরিবারের সদস্যদের ধর্মীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে।
উপসংহারঃ
তারাবির নামাজ রমজান মাসের অন্যতম ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। এটি আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায় এবং গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। ইতিহাস থেকে শুরু করে বর্তমান যুগ পর্যন্ত এর গুরুত্ব অপরিসীম। যারা নিয়মিত তারাবির নামাজ আদায় করেন, তারা ইহকাল ও পরকালে শান্তি ও কল্যাণ লাভ করেন। তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত তারাবির নামাজের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা এবং যথাযথভাবে আদায় করা।
ভালবাসা রইল
Thanks! AMADER SATHE THAKAR JONNO